সুনামগঞ্জ , বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ , ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
৬৪৭৬ জন অমুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিল ডিসি সম্মেলন শুরু ৩ মে, থাকছে ৪৯৮ প্রস্তাব সুনামগঞ্জসহ ৫ জেলায় বন্যার পূর্বাভাস আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উদযাপিত জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেল ছায়ার হাওর কাটা ধানে গজাচ্ছে চারা জলাবদ্ধতায় ডুবছে হাওরের ধান, অসহায় কৃষক হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে ব্যারাকে ফিরবে সেনাবাহিনী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিরাইয়ে পৃথক দুই সংঘর্ষে আহত ৪০ হাওর বাঁচাতে আলাদা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব সংসদে ফজলুর রহমানের বক্তব্যে তোলপাড় লোকবলের অভাবে চালু হচ্ছে না আইসিইউ, আড়াই বছর ধরে কক্ষ তালাবদ্ধ অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ডুবছে জমির ধান চরম দুর্দশায় হাওরের কৃষক জামালগঞ্জে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত আকস্মিক বন্যার শঙ্কা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা বজ্রপাতে সবচেয়ে ঝুঁকিতে জামালগঞ্জ কী করছেন ‘মাস্টারমাইন্ড’ মাহফুজ আলম হাওরে আশ্রয়কেন্দ্র এবং বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপনের দাবি এমপি কামরুল ধান নিয়ে চতুর্মুখী বিপদে কৃষক

জলাবদ্ধতায় ডুবছে হাওরের ধান, অসহায় কৃষক

  • আপলোড সময় : ৩০-০৪-২০২৬ ১২:৩২:৩৭ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ৩০-০৪-২০২৬ ১২:৩৫:০৪ পূর্বাহ্ন
জলাবদ্ধতায় ডুবছে হাওরের ধান, অসহায় কৃষক
বিশ্বজিত রায়::
সিকিভাগ ধানও ঘরে তুলতে পারেননি সুনামগঞ্জের দুই লাখ কৃষকের অধিকাংশ বোরো চাষী। চোখের সামনে পাকা ধান নষ্ট হচ্ছে দেখে নীরব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন তাঁরা। টানা বৃষ্টিতে হাত-পা গুটিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন বৈরী আবহাওয়ার দিকে। এর মধ্যে মধ্যনগর উপজেলার ইকরাছই ও জিনারিয়া বাঁধ, দেখার হাওরের গুজাউনি বাঁধসহ বেশ কয়েকটি বাঁধ ভেঙে হাওর তলিয়েছে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার খরচার হাওরের হরিমোহনের ভাঙায় নির্মিতব্য স্থায়ী বাঁধটি ছাড়াও অন্য বাঁধগুলো চরম ঝুঁকিতে আছে।
ভারি বৃষ্টির সাথে বজ্র আতঙ্ক, বন্যার পূর্বাভাস ও বাঁধ ভেঙে হাওর ডুবে যাওয়ার চতুর্মুখী বিপদে ফলন ঘরে তোলার হাল একরকম ছেড়েই দিয়েছে লক্ষাধিক কৃষিজীবী পরিবার। বৈরী আবহাওয়ার সাথে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিকল্পনাহীন বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের দায়সারা কার্যক্রমকে দায়ী করছেন অনেকে। কৃষক সচেতনমহল ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারি বৃষ্টিতে ফুলেফেঁপে ওঠা নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁইছুঁই করছে। পানির চাপে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মেরামতকৃত ৪২টি হাওরের ৭১০টি প্রকল্পের অধিকাংশ বাঁধই উচ্চঝুঁকিতে আছে। ফাটল দেখা দিয়েছে অনেক বাঁধে। হাওরজুড়ে এবার বাঁধ ভেঙে সব তলানোর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার পাশাপাশি হাওর অভ্যন্তরে আফর (বাঁধ) ভেঙে ইতিমধ্যে বিশ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খারাপ আবহাওয়ায় জানপ্রাণ সপে দিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না কৃষকের। টানা বৃষ্টিতে কর্তনকৃত ধানে অংকুর গজিয়ে কৃষকের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার দুপুর পর্যন্ত সুনামগঞ্জের হাওরে ৫৬ ভাগ এবং নন হাওরে ১৩ ভাগসহ গড়ে ৪৭ ভাগ ধান কর্তন করা হয়েছে। ১ লাখ ৬ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে এ পর্যন্ত। ১ লাখ ১৬ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমির ধান কাটা এখনও বাকি আছে। 
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার ১৩৭টি হাওরে এ বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। উৎপাদিত বোরো ধানের মূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
নয়ন ভাগায়ও মিলছে না শ্রমিক : হাওরাঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত ও বজ্রপাত আতঙ্কের কারণে ধান কাটতে পারছেন না কৃষক। কিছু কিছু হাওর এলাকায় বাড়তি টাকা দিয়ে ধান কাটতে পারলেও অনেক জায়গায় নয়ন ভাগায়ও (অর্ধেক মালিকের, অর্ধেক শ্রমিকের) মিলছে না শ্রমিক। পাকা ধান পানিতে তলিয়ে কিংবা কর্তনকৃত ধান শুকাতে না পারায় চোখের সামনেই নষ্ট হতে দেখছেন কৃষকেরা। দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের সরালীতোপা গ্রামের কৃষক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ৩০-৩৫ কিয়ার (৩০ শতকে এক কিয়ার) জমি করছিলাম। ৭ কিয়ারের মতো কাটছি। বাকি ধানের ইজাডা (ধানের শীষ) শুধু বাওয়া আছে। ধান কাটতে বেপারি পাইতাছি না। নয়ন ভাগা (অর্ধেক অর্ধেক) দিয়াও কেউ কাটতে চায় না। যেটুকু কাটছিলাম এইডাও টালে থাইক্যা নষ্ট হইতাছে। শুকাইতে পারতাছি না। তিনি বলেন, হাওরে বারোআনা ধানই কাটার বাকি। আগে ডুবরায় খাইছে, এখন যেইভাবে বৃষ্টি হইতাছে, বাকি ধান বন্যার পানিতে ডুইব্যা যাইব। বান (বাঁধ) দিয়া যদি হাওর না বাঁচে তাহইলে এইভাবে বান-টান দিয়া লাভ নাই।

বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার পলাশ ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামের কৃষক স্বপন কুমার বর্মণ বলেন, ৩৬ কিয়ারের মধ্যে ৮-১০ কিয়ারের মতো জমি কাটা হয়েছে। কর্তনকৃত ধান অংকুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিক না থাকায় বাকি জমি কাটা সম্ভব হচ্ছে না। হাওর ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার সব জমি খরচার হাওরে। এই হাওরের হরিমোহনের ভাঙায় যে স্থায়ী বাঁধ দেওয়া হচ্ছে সেটা চরম ঝুঁকিতে আছে। ওই বাঁধ যেকোন সময় ভেঙে ১০-১২ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যেতে পারে। স্থানীয় কৃষি অফিস যদিও বলছে, এই হাওরের ধান সামান্য কাটার বাকি আছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। আমরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।
বৈরি আবহাওয়া ও অপরিকল্পিত বাঁধই দায়ী :
এবারের বোরো মৌসুম শুরু হয়েছিল খরা দিয়ে। একপর্যায়ে খরতাপে বোরো ফলন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয় হাওরে। ৮ মার্চের স্বস্তির বৃষ্টিতে সেই শঙ্কা কেটে যায়। এরপর প্রায় দেড় মাসের বেশি সময়ের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় রূপ নেয় হাওর। এতে অন্তত ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির ধান নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কৃষি বিভাগ বলছে, ক্ষতির পরিমাণ আরও কম। কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জলাবদ্ধতায় প্রায় ৯ হাজার হেক্টর বোরো জমি আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান। ২০১৭ সালের প্রলয়ংকরী হাওর বিপর্যয়ের পর বোরো ফসল ঝুঁকিমুক্ত রাখতে নতুন কাবিটা নীতিমালায় হাওর রক্ষা বাঁধের কাজ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পাউবো’র তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১২ উপজেলার ৪২টি হাওরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের কাজ হয়েছে। এবারের প্রাক্কলন ব্যয় ১৪৫ কোটি টাকা। কোটি কোটি টাকায় মেরামত করা অপরিকল্পিত বাঁধই এখন কৃষকের গলার কাটা বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা। সুনামগঞ্জ কৃষক সংগ্রাম সমিতির সহ-সভাপতি খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, অতীতে এর চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির হওয়ার মতো অবস্থা হয়নি। কোন ধরনের গবেষণা ছাড়াই মনগড়া প্রাক্কলন করে বাঁধ দেওয়া হচ্ছে। বাঁধের মাটি গিয়ে হাওর ও নদী ভরাট হচ্ছে। নদী, খাল, বিল খনন করার পাশাপাশি পরিকল্পনামাফিক বাঁধ নির্মাণ না করলে প্রতি বছর কৃষক বিপদে পড়বে।
ভারি বৃষ্টিতে বন্যার আশঙ্কা : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য আগামী চার-পাঁচদিন কোন সুখবর নেই। এই কয়দিন সুনামগঞ্জে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাই বেশি। এতে নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যা হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, সুরমা নদীর পানি গড়ে ৫০ সেন্টিমিটার এবং কুশিয়ারা নদীর পানি ১০০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এই নদীগুলোর পানি যদিও ২ থেকে ৩ মিটার বিপৎসীমার নীচে আছে, তবে আগামী তিনদিনই পানি বাড়তে থাকবে এবং বিপৎসীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা আছে।
আগামী কয়েকদিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ভারতের চেরাপুঞ্জির চেয়ে দেশের অভ্যন্তরে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ২০ থেকে ৩০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ বৃষ্টিপাতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, বৃষ্টিতে ধান কাটা যাচ্ছে না। কৃষক যতটুকু কাটতে পারছেন তাও শুকাতে পারছেন না। এর মধ্যে অনেক ধানে অংকুর গজিয়েছে। কৃষক ভিজা ধান যাতে অটো রাইস মিলে বিক্রি করতে পারে সে রকম কথাবার্তা চলছে। ভিজা ধান পলিথিন দিয়ে না ঢেকে উঁচু স্থানে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ভারি বৃষ্টি ও পানি বাড়তে থাকায় ১১০টি ক্লোজার (ভাঙা) সহ অন্যান্য বাঁধও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এখন পর্যন্ত যে দু’একটি বাঁধ ভেঙেছে এগুলো পাউবো’র আওতাভুক্ত নয়। পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণের পানিতে বন্যার শঙ্কা রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, মধ্যনগর, ধর্মপাশা) আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমি এই মুহূর্তে মধ্যনগরের জিনারিয়া বাঁধে আছি। কৃষক চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় আছে। প্রকৃতিসৃষ্ট এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স